Friday , May 24 2019
Breaking News
Home / সংবাদ / একটি শিশুর বাবা হারানোর গল্প, মা এখন জেলে !

একটি শিশুর বাবা হারানোর গল্প, মা এখন জেলে !

লেখক- হাফিজুর রহমান
উপ-পুলিশ পরিদর্শক, বাংলাদেশ পুলিশ

দুজনেই ছিলেন গার্মেন্টস কর্মী, পরিচয়ের সূত্রপাত এখান থেকেই। তারপর কিছু কথা, ভাল লাগা। একসময় উভয় পরিবারে সম্মতিতেই হয়েছিল বিয়ে। একটি ফুটফুটে মেয়ে শিশুও আছে তাদের সংসারে। গার্মেন্টস-এ চাকুরির সুবাদে থাকেন ভাড়া বাসায়। কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ততা পেরিয়ে বাসায় ফিরে মেয়েটিকে আদর করত বাবা। মেয়েটি ছিল বাবার ভক্ত। বাবার অপেক্ষায় থাকত কখন আসবে বাবা। বাবার খুনসুটিতে মা কখনও বিরক্ত হতেন, মেয়েকে দু’চারটা বকাও দিতেন। তবে বাবার এ স্নেহ থেকে এত দ্রুত বঞ্চিত হবে মেয়েটি তা ছিল কল্পনাতীত। গল্পটাও ভিন্ন রকম।

শুক্রবার দুপুরে পর থানায় একটি ফোন এলো অপরিচিত নম্বর থেকে। ভদ্র মহিলা জানালেন, তার বাসার পাশে একটা সন্দেহজনক রক্তমাখা বস্তা পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে ওই এলাকার মোবাইল ডিউটি পুলিশ দলকে পাঠালেন সেখানে। পুলিশ গিয়ে অন্যান্যদের উপস্থিতিতে বস্তা খুলে পেলেন হাত, পা, মাথা ছাড়া একটি পুরুষের মৃত শরীরের অংশ। খবর পেয়ে ওসি ও অন্যান্য অফিসার ছুটে এলেন সেখানে। এরপর আশপাশে খুঁজে বিচ্ছিন্নভাবে পড়ে থাকা পা পাওয়া গেলেও পাওয়া গেল না মাথার অংশ ও হাত। দক্ষ পুলিশ দলের বদ্ধমূল ধারণা এ লাশ দূর থেকে আসেনি, এখানেই ঘটেছে হত্যাকান্ড। এরপর আশেপাশের বাসাগুলোতে তন্ন তন্ন করে খোঁজা হল।

একটি বাসার সামনে পাওয়া গেল কয়েক ফোটা রক্তের চিহ্ন। পুলিশের চোখ বলে কথা। কিন্তু বাসায় থাকা মহিলার আপত্তি সেটা রক্ত নয়, পানের পিক। কিন্তু পুলিশের সন্দেহ সেই রক্ত নিয়েই। মহিলাকে যতবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে ততবারই সে এটাকে রক্ত বলতে নারাজ। এরপর মহিলার বাসায় খাটে তোষকের নিচে পাওয়া গেল একটি রক্তমাখা বস্তা। এখানেও মহিলার একই সুর, ওই বস্তায় করে মুরগী জবাই করে বাজার থেকে আনা হয়েছিল। তবে পুলিশের সন্দেহটা আরও বেড়ে গেল। ততক্ষণে সন্ধ্যা গড়িয়েছে। বাসার সামনে একটি ময়লার ড্রাম। আশেপাশের বাসার লোকজন সেখানে ময়লা জমা করে রাখেন। ড্রামটির ময়লা ফেলে এবার পাওয়া গেল একটি মানুষের মাথা আর দুটি হাতের অংশ। এবার অবশ্য মহিলা সনাক্ত করলেন এটি তার স্বামীর দেহাংশ। তবে কোথায়, কিভাবে, কখন, কে তার স্বামীকে হত্যা করেছে তা জানেন না তিনি। কিন্তু স্বামীকে খুঁজে না পেয়ে তিনি কাউকে জানাননি কেন? এমন প্রশ্নের সদুত্তর নেই তার কাছে।

মহিলার ঘর তল্লাশী করে হত্যার আলামত পাওয়া যায়। এরপর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে একসময় বেরিয়ে আসে রোমহর্ষক এ খুনের রহস্য। নিহত ব্যক্তির নাম রফিকুল ইসলাম (৩০)। ভাড়ায় বসবাস করতেন গাজীপুর জেলার শ্রীপুর পৌর এলাকার গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়িতে। স্ত্রী জেবুন নাহার ও মারিয়া আক্তার রোজা নামে চার বছরের মেয়েকে নিয়ে থাকতেন সেখানে। রফিকুলের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর থানা এলাকায়। স্ত্রী জেবুন নাহারের বাড়ি নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলা এলাকায়। পারিবারিক বিরোধের জেরে ২৪ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ভোরে স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া হয়। এসময় জেবুন নাহার বিছানায় শুয়ে থাকা স্বামী রফিকুলকে প্রথমে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে অচেতন করে। তারপর গামছা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এরপরের গল্পটা অন্যরকম। মৃত স্বামীর মরদেহ বাসার ওয়ার্ড্রবে ঢুকিয়ে রেখেই স্ত্রী জেবুন নাহার চলে যান তার কর্মক্ষেত্রে। মেয়েকে রেখে যান পাশেই বোনের বাসায়। রাত এগারোটায় মেয়েকে নিয়ে ফিরে আসেন নিজ বাসায়।

এবার মেয়েকে ঘুম পড়িয়ে ছক আঁকেন স্বামীর লাশ গুম করার। ধারালো বটি দিয়ে ছয় টুকরা করেন স্বামীর মৃতদেহ। এরপর বস্তায় ভরে আলাদা আলাদা করে লাশের টুকরাগুলো ফেলে দেন আশপাশে বিভিন্ন স্থানে। মাথা এবং হাতের অংশ রাখেন বাসার সামনে ময়লার ড্রামে। হত্যায় ব্যবহৃত ইট ও দেহ খন্ডিত করা ধারালো বটিটি লুকিয়ে রাখেন খাটের নিচে। জেবুন নাহারের তথ্যমতে উদ্ধার করা হয় রক্তমাখা বটি ও ইটটি। রফিকুলের পিতার অভিযোগে হত্যা মামলা রুজু হয় শ্রীপুর থানায়। গতকাল ২৬ জানুয়ারি, শনিবার বিজ্ঞ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন জেবুন নাহার। চার বছরের মেয়ে মারিয়া আক্তার রোজা এখনও বুঝতে পারেনি তার বাবা আর কখনও তাকে করবে না আদর। মা এখন জেলে। বাবা, মায়ের স্নেহ বঞ্চিত মেয়েটি বাবা বলে ডাকতে পারবে না কখনও। এমন রোমহর্ষক হত্যাকান্ডের দ্রুত রহস্য উদঘাটন ও আসামি গ্রেফতারে পুলিশকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সুধীজন।

print

About masum

Check Also

বাসায় পুলিশ এলে করণীয় কি ?

জেনে নিন কিছু অাইনগত পরামর্শ……..!!! আপনার বাসায় পুলিশ আসল তল্লাশির কাজে তখন আপনার কি কি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *